মাওলানা ভাসানী: মজলুম জননেতার জীবনী, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অবদান
ভূমিকা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তাঁকে সাধারণ মানুষ “মজলুম জননেতা” নামে ডাকত। তিনি ছিলেন কৃষক-শ্রমিকের অধিকার আদায়ের অগ্রদূত, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা এবং শোষণবিরোধী সংগ্রামের নেতা।
তাঁর নেতৃত্ব কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক।
---
১. জন্ম ও শৈশব
জন্ম: ১২ ডিসেম্বর ১৮৮০
জন্মস্থান: সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রাম
শৈশবেই পিতামাতা হারিয়ে তিনি এতিম হয়ে পড়েন। দুঃখ-দুর্দশার মধ্য দিয়েই তাঁর জীবন শুরু হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন।
---
২. শিক্ষা জীবন
মাদ্রাসায় পড়াশোনার মাধ্যমে তিনি ইসলামি জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে সুফিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক দর্শনের সমন্বয়ে তিনি নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শ তৈরি করেন। তাঁর শিক্ষা তাঁকে একজন সাধারণ আলেম থেকে জননেতায় পরিণত করে।
---
৩. রাজনৈতিক জীবনের সূচনা
প্রথমে কংগ্রেসে যোগ দিলেও পরে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তিনি দ্রুত সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন এবং কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে জননেতা হয়ে ওঠেন।
---
৪. কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্ব
বাংলাদেশের কৃষক দীর্ঘকাল শোষণের শিকার ছিল। ভাসানী কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন।
১৯৪৬ সালে টাঙ্গাইল অঞ্চলে কৃষক আন্দোলন
খাজনা মওকুফের দাবি
কৃষকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা
এসব আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি “কৃষকবন্ধু” হিসেবে খ্যাতি পান।
---
৫. আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
১৯৪৯ সালে “আওয়ামী মুসলিম লীগ” প্রতিষ্ঠিত হলে ভাসানী প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন।
তাঁর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ দ্রুত জনপ্রিয় হয়। পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে এ দল স্বাধীনতার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
---
৬. ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা
ভাসানী সর্বদা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলেছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি ছাত্রদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। তাঁর প্রেরণা ও নেতৃত্ব আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
---
৭. ন্যাপ (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) প্রতিষ্ঠা
১৯৫৭ সালে ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।
এই দল ছিল সমাজতান্ত্রিক চিন্তায় বিশ্বাসী এবং কৃষক-শ্রমিকের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
---
৮. আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভাসানী
ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
“ফর ইস্ট পিস কনফারেন্স”-এ অংশগ্রহণ
সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বক্তব্য
এভাবেই তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রগতিশীল নেতার স্বীকৃতি পান।
---
৯. পাকিস্তানি শাসনবিরোধী আন্দোলন
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন।
তিনি পূর্ব বাংলার মানুষকে অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত করেন। তাঁর নেতৃত্ব মুক্তির আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
---
১০. মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
সরাসরি নেতৃত্ব না দিলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছিল।
---
১১. ব্যক্তিগত জীবন
সাদা পোশাক, সাদামাটা খাবার
বিলাসবহুল জীবন থেকে দূরে থাকা
সন্তোষে তাঁর আশ্রম ছিল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত
তাঁর সরল জীবন তাঁকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়।
---
১২. মৃত্যু
১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁকে সমাহিত করা হয়। আজও লাখো মানুষ তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে যান।
---
১৩. উত্তরাধিকার ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা
মাওলানা ভাসানীর আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক। কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি, শোষণমুক্ত সমাজ ও সাম্যবাদী চিন্তাধারা এখনও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
---
📌 উপসংহার
মাওলানা ভাসানী ছিলেন বাংলার কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির প্রতীক। তাঁর সংগ্রামী জীবন আমাদের শেখায়— অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে এবং শোষিতের পাশে দাঁড়াতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন