স্বাধীনতার পর মুজিবের হাতে বাকস্বাধীনতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা

স্বাধীনতার পর মুজিবের হাতে বাকস্বাধীনতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা

স্বাধীনতার পর মুজিবের হাতে বাকস্বাধীনতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা

উপশিরোনাম: মুজিব সরকারের সিদ্ধান্তে একদিনেই বন্ধ হয় দেশের সব বেসরকারি দৈনিক, কেবল চারটি পত্রিকা টিকে ছিল সরকারি নিয়ন্ত্রণে।

স্বাধীনতার পর প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মানুষের স্বপ্ন ছিল একটি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার। সবাই আশা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে একটি সমাজ গড়ে উঠবে যেখানে থাকবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি।

কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর প্রশাসনিক দুর্বলতা সরকারকে কঠিন অবস্থায় ফেলে দেয়। পত্রিকাগুলো এই সমস্যা নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে—যা সরকারের চোখে হয়ে ওঠে “রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড”।

বাকশাল ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চিন্তা

স্বাধীনতার পর মুজিব একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশে সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে, একদলীয় শাসন ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।

এই কাঠামোয় গণমাধ্যমকে দেখা হয় “রাষ্ট্রীয় সহযোগী শক্তি” হিসেবে—অর্থাৎ সংবাদপত্রের ভূমিকা হবে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রচার করা, সমালোচনা নয়।

পত্রিকা বন্ধের দিন

স্বাধীনতার পর মুজিবের, সরকার এক অধ্যাদেশ জারি করে দেশের সব বেসরকারি পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। শুধুমাত্র চারটি দৈনিক চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়:

  • দৈনিক ইত্তেফাক
  • দৈনিক বাংলা
  • দৈনিক আজাদ
  • দৈনিক সংবাদ

এই চারটি পত্রিকা কার্যত সরকার-নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। সম্পাদকীয় নীতি, রিপোর্ট প্রকাশ—সবই নির্ধারিত হতো সরকারি দপ্তর থেকে।

সরকারি যুক্তি ছিল: “দেশে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে সংবাদপত্রকে শৃঙ্খলায় আনা প্রয়োজন।”

কিন্তু এই শৃঙ্খলার আড়ালে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রায় সম্পূর্ণরূপে স্তব্ধ হয়ে যায়। শত শত সাংবাদিক চাকরি হারান; কেউ কেউ বাধ্য হন পেশা ছেড়ে দিতে।

সাংবাদিক সমাজের প্রতিক্রিয়া

তৎকালীন কঠোর রাজনৈতিক পরিবেশে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তবুও সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে পরবর্তীকালে এই সময়কে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কালো অধ্যায়।”

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে। তারা একে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে গণমাধ্যম স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় ধাক্কাগুলোর একটি বলে উল্লেখ করে।

ঘটনার প্রভাব

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। পরে কিছু পত্রিকা পুনরায় প্রকাশের অনুমতি পেলেও সেই ভয় ও সেন্সরশিপ দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়।

  • সাংবাদিকরা আত্মসেন্সরশিপে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
  • সমালোচনাহীন পরিবেশে সরকার ও সমাজের জবাবদিহিতা দুর্বল হয়।
  • সত্য প্রকাশের জায়গা ছোট হতে থাকে।

ঐতিহাসিক মূল্যায়ন

শেখ মুজিবের এই পদক্ষেপকে আজও ইতিহাসে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। অনেকে বলেন—অরাজক পরিস্থিতি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রয়োজনে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।

আবার অনেকে মনে করেন—এটি মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত।

বাস্তবতা হলো, যখন সংবাদপত্র রাষ্ট্রের মুখপাত্রে পরিণত হয়, তখন সত্যের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে যায়। আর গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল তখনই, যখন সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে সত্য বলার সাহস রাখে।

উপসংহার

স্বাধীনতার পর কেবল কিছু পত্রিকা বন্ধ হয়নি, থেমে গিয়েছিল বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের একটি সম্ভাবনাময় ধারা। আজও যখন আমরা স্বাধীন সাংবাদিকতা বা মিডিয়া ফ্রিডম নিয়ে কথা বলি, তখন সেই সময়ের ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়—

“স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক নয়, চিন্তা ও প্রকাশের স্বাধীনতাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।”

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক: বাংলার রাজনীতির অমর নেতা ও সমাজ সংস্কারক

জিয়াউর রহমান: বাংলাদেশের এক চিরস্মরণীয় নেতা

মাওলানা ভাসানী: মজলুম জননেতার জীবনী, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অবদান